শিক্ষক নিয়োগ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কি আদমজীর পরিণতি আসন্ন?

সম্প্রতি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারিত যোগ্যতা শিথিল করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ প্রতিনিয়ত পত্রিকার শিরোনাম। ‘ভিসির মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ দিতেই নীতিমালা বদল’—এ শিরোনামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সংবাদ এসেছে প্রথম আলোয়। খবরে মঞ্জুরি কমিশনের তদন্ত কমিটির বরাতে বলা হয়েছে, ‘উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। উপাচার্য পদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। শিথিলের সুযোগে নিয়োগ পাওয়া ৩৪ শিক্ষকের নিয়োগ বাতিলে নির্দেশের সুপারিশ’ করা হয়েছে। একলপ্তেই ৩৪ জন অযোগ্য ব্যক্তিকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের শামিল, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মারাত্মক প্রতারণা। এ রকম অজস্র শিক্ষক সব বিশ্ববিদ্যালয়েই আছেন, যাঁরা যোগ্যদের হটিয়ে বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঠকিয়ে যাচ্ছেন।


দেশের উচ্চশিক্ষা মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার (ইউজিসি) তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পরও প্রচলিত সংস্কৃতি অনুযায়ী তদন্তকে ‘পক্ষপাতমূলক’ দাবি করে বলা হচ্ছে, ‘নিয়ম মেনেই নিয়োগ হয়েছে’। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় এমন নিয়োগ নতুন কিছু নয়। সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনের পর দিন এমন নিয়োগ একধরনের ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ বললে অত্যুক্তি হবে না। আবার সব অনিয়মের খবর যে চাউর হয়, তা–ও না। ‘রুটি ভাগাভাগির’ পরিমাণ কম হলেই কেবল মানুষ বা করদাতারা এসব জানতে পারেন। যেমন কিছুদিন আগে চাকরিপ্রত্যাশী একজনের সঙ্গে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্তাব্যক্তির ‘দর-কষাকষির’ ফোনালাপ এখনো সবার মুখে মুখে। অন্যদিকে, প্রথম আলোর ২০ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ কলেবরে বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু কমেছে গুণে–মানে। এ কারণে বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ে দিন দিন অবনমন।

২০১৪ সালের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকের প্রায়োগিক ক্লাসে সবাইকে ইংরেজিতে যশোর নামের একটা ফোল্ডার খুলতে বললাম। বিশ্বাস করুন, ঢাকার নামীদামি কলেজের কেউ সঠিকভাবে বানানটি লিখতে পারল না! ‘মেধাবী’ এক তরুণ ২০১৫ সালে তাঁর থিসিস পড়তে অনুরোধ করল। সম্পূর্ণ থিসিসে নদনদী ও জেলাগুলোর বানান বেমালুম ভুল! এগুলো সবই শিক্ষায় সংখ্যা বাড়ানোর ফসল, মানের নয়।


সম্প্রতি বৈশ্বিক এক প্রতিবেদনে দেশের উদ্ভাবনীর বিকাশ তলানিতে বলে জানা যায়, কিন্তু উন্নয়নের মহাসড়কে থাকা দেশের উদ্ভাবন কমবে কেন? প্রশ্ন হচ্ছে, সবাই পারে, আমরা কেন পারি না? আমাদের না পারার কারণ কী? উন্নত বিশ্বের সবাই মানুষ, আমরাও তাই—এই যুক্তিতে আমাদেরও পারা উচিত। আমাদের সম্পদ সীমিত, কিন্তু সক্ষমতা ও মেধার যোগ্যতা বিষয়ে দেশে তো বটেই, বহির্বিশ্বে কারও কোনো দ্বিধা নেই। বহু আগে থেকেই দেশে–বিদেশে আমাদের উদ্ভাবনীর বড় বড় উদাহরণ রয়েছে, কিন্তু এখন কেন হ্রাস পাবে। চলুন, সমালোচকের দর্পণে দেখি।


দেশে–বিদেশে গবেষণা সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত জ্ঞান ও উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠান। এগুলোর কাজই হচ্ছে নতুন জ্ঞান তৈরির পাশাপাশি সমাজের জন্য মঙ্গলজনক উদ্ভাবন। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বিশ্বে, উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানে যেকোনো পর্যায়ে নিয়োগের সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলি লিখিত আকারে রয়েছে। প্রতিটি ধাপেই প্রার্থীকে উপযুক্ততার প্রমাণ দিতে হয় সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে। সাধারণত, সশরীরে বা কখনো অনলাইন/টেলিফোনে। বিজ্ঞাপিত পদের বিপরীতে প্রার্থীকে আমলনামা বানাতে হয় পূর্বনির্ধারিত আবশ্যিক ও কাঙ্ক্ষিত নির্ণায়কের ভিত্তিতে। শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি নয়, প্রার্থীর উপস্থাপনার মুনশিয়ানা, গবেষণা/শিক্ষকতার দর্শন, আচার–আচরণ, কথাবার্তার ধরন, সৌজন্যবোধ ইত্যাদিও অত্যন্ত গুরুত্ববহ।

অন্যদিকে, আমাদের দেশে নিয়োগপ্রক্রিয়া দু–তিনটি ধাপে হলেও ভিসি/প্রোভিসি/সমমানের কমিটির মতামতই চূড়ান্ত। প্রতিষ্ঠানের ‘দলীয়’ কর্তাব্যক্তিদের মতামতও শিরোধার্য। এমনকি এটা প্রার্থীর সংশ্লিষ্ট বিভাগের বাইরেও হয়। সাম্প্রতিক সময়ে স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা, নির্বাচন কমিটির সঙ্গে প্রার্থীর হৃদ্যতা, বাবা/মামা/চাচার জোর ও ‘দলীয়’ সংশ্লিষ্টতা প্রার্থীর উপযুক্ততা নির্ধারণে দুর্দান্ত ভূমিকা রাখে। মোটাদাগে তাই প্রার্থী সাপেক্ষে নির্ধারিত হয় যোগ্যতা ও নিয়মকানুন। বলা বাহুল্য, উন্নত বিশ্বে উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে দু-একটা অনিয়ম যে হয় না, তা নয়, কিন্তু ‘সাগর চুরি’ বিরল। এসব দেশে দীর্ঘ মেয়াদে সমাজের অনিষ্ট হয়—এমন কিছু পরিত্যাজ্য, কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গের মতামতই প্রণিধানযোগ্য; দেশের জন্য অমঙ্গলজনক হলেও কার কী আসে–যায়! আর হবেই না কেন, আমাদের দেশের সংস্থাগুলোর নিয়োগ বোর্ডের প্রধানেরা যে অসীম ক্ষমতাধর! ওপরের উদাহরণটি (যোগ্যতা শিথিল করে নিয়োগ) এ ক্ষেত্রে কি যথেষ্ট নয়?


আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছেলেমেয়েরা আসে তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, কিন্তু বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা শুধু তাদের মেধাকে নষ্টই করে না, দীর্ঘ মেয়াদে করে তোলে স্বপ্নহীন, পথভ্রষ্ট। শুধু ছাত্রছাত্রীরা কেন, শিক্ষকেরাও কি কোনো অংশে কম? বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন রঙের দল। একসময় শিক্ষকদের রাজনীতিতে মেধাবীদের আধিক্য থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা হু হু করে কমছে, বাড়ছে অমেধাবীদের ‘অভাবনীয়’ দৌরাত্ম্য। বাড়বেই না কেন? রাজনীতিতে জড়িত হলে পড়ালেখার দরকার হয় না, কেননা জবাবদিহি তো আর নেই। তা ছাড়া, পদোন্নতি হয় রকেটের গতিতে, তৈরি হয় নানা পদের সুযোগ আর বোনাস হিসেবে ‘অসীম ক্ষমতা’।

রাজনীতির মতো সমাজের সর্বক্ষেত্রে বেড়ে চলেছে তথাকথিতদের সংখ্যা, আর শিক্ষাব্যবস্থা তো সমাজেরই অংশ। চারদিকে তাই অমেধাবীদের জয়জয়কার। ফলে, যা শিখছি হয় ভুল শিখছি তা না হলে পাচ্ছি বাস্তবতাবিবর্জিত শিক্ষা, যা সমাজের চাহিদার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। যেমন বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমান করোনা মহামারিতে যেখানে টিকা আবিষ্কারে মত্ত, আমরা সেখানে স্যানিটাইজার তৈরিতে ব্যস্ত! যদি উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বা পদোন্নতি হয় ‘ব্যক্তিস্বার্থে’ বা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের’, তবে স্যানিটাইজারের চেয়ে বেশি আর কী আশা করা যায়।


স্বাধীনতার আগে প্রতিষ্ঠিত দেশের চারটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় চলে ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুসারে। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের কাছে শুনেছি, স্বাধীন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে উৎসাহিত ও লালন করার জন্যই এ অধ্যাদেশ হয়েছিল। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে এই অধ্যাদেশ যেমন যুগোপযোগী করা হয়নি—যৎসামান্য পরিবর্তন/সংশোধন হয়তো হয়েছে। আবার একই অধ্যাদেশের আওতাভুক্ত হলেও চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সমপদ্ধতি অনুসৃত হয় না। আর এই সুযোগই নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা। কোথায় তাঁরা সৃজনশীলতা আর উদ্ভাবনের বিকাশে কর্মকৌশল, রূপকল্প প্রণয়ন করবেন, তা না করে নিত্যনতুন ‘সমজাতীয়’ বিভাগ খুলে ‘অমেধাবীদের’ নিয়োগে আগ্রহী বেশি। দেশকে তাই প্রতিবছর গুনতে হয় মোটা অঙ্কের বেতন-ভাতা, জাতীয় ক্ষেত্রে যার প্রতিদান যৎসামান্য। বলা বাহুল্য, এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্তাব্যক্তিরা কাঠের চশমা চোখে দিয়ে মুহূর্তেই বনে যান ‘অতি রাজনৈতিক’। এহেন ব্যক্তি/ব্যক্তিদের হাতে উচ্চশিক্ষার প্রসার ও গুণগত মান রক্ষার আশা আকাশকুসুম কল্পনা। এমন অবস্থা চলতে থাকলে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘আদমজী পাটকলের’ ভাগ্য বরণ করতে হয়তো সময় লাগবে না। সেটারও পতনের কারণ ছিল কর্তাব্যক্তিদের দুর্নীতি।

ড. আশরাফ দেওয়ান স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস, কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া।

Source: Prothom Alo

Leave a Comment